শিক্ষা বার্তা
যশোরে পিইসিতে বৃত্তি জালিয়াতি
অসাধুদের স্বপদে রেখেই পরীক্ষা গ্রহণের সিদ্ধান্ত
এম.আইউব ও ফয়সল ইসলাম :
Published : Wednesday, 15 November, 2017 at 4:34 AM
অসাধুদের স্বপদে রেখেই পরীক্ষা গ্রহণের সিদ্ধান্তযশোরে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনীতে (পিইসি) বৃত্তি জালিয়াতির সুযোগ রেখেই ১৯ নভেম্বর থেকে শুরু হচ্ছে পরীক্ষা। আর এ কারণে গত কয়েক বছরের মতো এবারো পঞ্চম শ্রেণীর শিশু শিক্ষার্থীদের মেধার অবমূল্যায়নের আশংকা করছেন শিক্ষকরা। সাথে সচেতন অভিভাবকরাও। ভুক্তভোগী শিক্ষকরা আশা করেছিলেন, এবার জালিয়াতি-দুর্নীতি বন্ধে কমপক্ষে কেন্দ্র সচিবদের অদল-বদল করা হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা আর হলো না। ফলে, অবুঝ শিশুদের অনেকেই অবমূল্যায়নের শিকার হতে পারে বলে আশংকা তাদের।
দীর্ঘদিন ধরে যশোরে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনীর বৃত্তি নিয়ে জালিয়াতি-দুর্নীতি হয়ে আসছে। এটি ধরাও পড়ছে। তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে। তারপরও জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। ঘুরেফিরে জড়িতরাই দায়িত্ব পাচ্ছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত বছর প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনীর বৃত্তি নিয়ে যশোরের চৌগাছায় জালিয়াতির ঘটনা ঘটে। উপজেলার পাতিবিলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নির্ধারিত রোল নম্বরে প্রকৃত ছাত্রীর নামের পরিবর্তে অন্য দুই জনের নাম লিখে তাদের বৃত্তি দেয়া হয়। জালিয়াতির এই বৃত্তি নিয়ে জারি হয় গেজেটও। বিষয়টি ফাঁস হলে পরবর্তীতে তা সংশোধন করা হয়। কেবল চৌগাছায় না, অন্যান্য উপজেলায়ও প্রাথমিকের বৃত্তি নিয়ে জালিয়াতি হয়ে আসছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। এই জালিয়াতির সাথে কেন্দ্র সচিব, ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও উপজেলা সহকারী শিক্ষা অফিসার কিংবা শিক্ষা অফিসাররা প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে জড়িত বলে সূত্রের দাবি।
পরীক্ষার সাথে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, মূলত বৃত্তি জালিয়াতির সাথে কেন্দ্র সচিবরা জড়িত। তারা নিজেদের কেন্দ্রে সিটপ্লান করার সময় জালিয়াতির প্রথম ধাপ সম্পন্ন করেন। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, হলসুপারদের সাথে নিয়ে সিটপ্লান করবেন কেন্দ্র সচিব। কিন্তু জালিয়াতির সাথে জড়িত কেন্দ্র সচিবরা সেটি করেন না। হলসুপার যাওয়ার আগেই তিনি তার মতো করে সিটপ্লান সাজিয়ে ফেলেন। সুবিধাজনক কক্ষে নিজের পছন্দের পরীক্ষার্থীদের বসান। এরপর এমনসব শিক্ষককে ওই কক্ষে দায়িত্ব দেন যারা সবধরনের প্রশ্নের উত্তর মুখে মুখে বলে দিতে পারেন। বিশেষ করে প্রতিটি বিষয়ের টিকচিহ্ন নির্ভুল করে দেন কেন্দ্র সচিবের পছন্দের কক্ষ পরিদর্শকরা। এ সময় তারা ম্যানেজ করেন কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত অন্যান্য কর্মকর্তাদের। অভিযোগ রয়েছে, কক্ষ পরিদর্শকরা কেন্দ্র সচিবের কথামতো উত্তর বলে দিলেও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা নিরব দর্শকের ভূমিকায় থাকেন। তারা যেন কোনোকিছু দেখেও দেখেন না। এ ধরনের ঘটনা উপজেলা শিক্ষা অফিসার (টিইও) কিংবা সহকারী শিক্ষা অফিসাররা (এটিইও) জেনে গেলেও অজ্ঞাত কারণে চেপে যান। এ কারণে একটি ইউনিয়নের বেশিরভাগ বৃত্তি চলে যাচ্ছে নির্দিষ্ট কিছু স্কুলে। অন্যান্য শিশু শিক্ষার্থীরা বৃত্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অবমূল্যায়ন হচ্ছে মেধার। অবিচারের শিকার হচ্ছে একেবারেই শিশু বয়স থেকেই।
এতো গেল একটি দিক। জালিয়াতির আরো কিছু উপায় উঠে এসেছে অনুসন্ধানে। পরীক্ষা শেষে কিছু কেন্দ্রে উত্তরপত্রও ওলটপালট করা হয়ে থাকে। কেন্দ্র সচিবদের সরাসরি তত্ত্বাবধানে এক পরীক্ষার্থীর রোল নম্বরের পাশে আরেক জনের নাম লিখে বৃত্তি বদলানোর ভয়াবহ তথ্য মিলেছে। চৌগাছার পাতিবিলা স্কুলই তার বড় প্রমাণ।
আগামী ১৯ নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় এ বছর যশোর জেলায় ৫০ হাজার ৮শ’ ৭৬ জন পরীক্ষার্থীর অংশ নেয়ার কথা। জেলার আট উপজেলায় ১শ’ ৪২ টি কেন্দ্রে এই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। সদর উপজেলায় ২৬ কেন্দ্রে পরীক্ষা দেবে ১২ হাজার ২শ’ ৪৯ জন পরীক্ষার্থী। এ ছাড়া, শার্শায় ১৩ কেন্দ্রে  ৫ হাজার ১শ’ ৭৭, ঝিকরগাছায় ১৩ কেন্দ্রে ৫ হাজার ১শ’ ১১, চৌগাছায় ১৯ কেন্দ্রে ৪ হাজার ৬শ’ ১২, কেশবপুরে ১৯ কেন্দ্রে ৩ হাজার ৯শ’ ১০, অভয়নগরে ১২ কেন্দ্রে ৩ হাজার ৮শ’ ৫৬, বাঘারপাড়ায় ১৭ কেন্দ্রে ২ হাজার ৯শ’ ৭৪ ও মণিরামপুরে ২৩ কেন্দ্রে ৬ হাজার ৪শ’ ৮০ পরীক্ষার্থীর অংশ নেয়ার কথা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, জেলার বেশ কয়েকটি কেন্দ্রে বৃত্তি নিয়ে জালিয়াতি হয়ে আসছে। যেসব কেন্দ্রে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি হচ্ছে তার মধ্যে সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র, লেবুতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র, রামনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র, বাহাদুরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র, পুলেরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র ও নারাঙ্গালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র অন্যতম বলে সূত্র জানিয়েছে। এ ছাড়া, বাঘারপাড়ায় দোহাকুলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র ও রায়পুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র, কেশবপুরের আলতাপোল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র ও কেশবপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র, ঝিকরগাছার বাঁকড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র, গঙ্গানন্দপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র এবং চৌগাছার পাতিবিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র, আন্দুলিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র, বুদ্ধলিতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র ও খরিঞ্চা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের বিরুদ্ধে বৃত্তি জালিয়াতির অভিযোগ সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একাধিক সূত্র জানিয়েছেন, ২০০৯ সাল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা শুরু হয়েছে। শুরুর দিকে বিভিন্ন হাইস্কুলে এই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হতো। কেন্দ্র সচিব থাকতেন ওই হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক। যতদিন হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষকরা কেন্দ্র সচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন ততদিন কোনো রকম কোনো অভিযোগ ওঠেনি বলে সূত্র জানিয়েছে। যখনই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের কেন্দ্র সচিব করা হয়েছে তখন থেকে বৃত্তি নিয়ে জালিয়াতির অভিযোগ ওঠা শুরু করে।
এসব জালিয়াতি বন্ধে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস এ বছর একটি উদ্যোগ নেবে বলে আশা করেছিলেন শিক্ষকরা। শোনা যাচ্ছিল, বৃত্তি জালিয়াতি বন্ধ করতে এ বছর কেন্দ্র সচিবদের ওলট-পালট করবেন জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা। কিন্তু শেষ অবধি তা হয়নি। দেয়া হয়নি কঠোর কোনো নির্দেশনাও। কেন্দ্র সচিব ও প্রধান শিক্ষকদের মাসিক সভায় উপস্থিত একাধিক সূত্র এমন তথ্য দিয়েছেন। তারা বলেছেন, জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা গতানুগতিক বক্তব্য দিয়ে দায়িত্ব শেষ করেছেন। যার ফলে অনেক মেধাবী শিশু শিক্ষার্থী আবারো বৃত্তি বঞ্চিত হতে পারে বলে আশংকা করছেন শিক্ষকরা।
বৃত্তি নিয়ে শিক্ষার্থীরা যাতে অবিচারের শিকার না হয় সেই কারণে এখনই কেন্দ্র সচিবদের মধ্যে পরিবর্তন আনা জরুরী বলে মনে করছেন ভুক্তভোগী শিক্ষকদের অনেকেই।
এ ব্যাপারে যশোর জেলা শিক্ষা অফিসার তাপস কুমার অধিকারীর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘নলেজে আছে। কী করা যায় দেখি।’



সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : gramerka@gmail.com, editor@gramerkagoj.com
Design and Developed by i2soft