দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল
চৌগাছা হাসপাতালের দুর্নীতি তদন্তে কমিটি গঠন
সরকারি টাকা হাতিয়ে কোটি টাকার সম্পদের মালিক সামসুর
শাহানুর আলম উজ্জ্বল, চৌগাছা (যশোর) থেকে :
Published : Wednesday, 15 November, 2017 at 4:31 AM
সরকারি টাকা হাতিয়ে কোটি টাকার সম্পদের মালিক সামসুরযশোরের চৌগাছার জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত ৫০ শয্যা মডেল হাসপাতালের ল্যাব টেকনোলজিস্ট সামসুর রহমান সীমাহীন দুর্নীতি মাধ্যমে এখন কোটি টাকার সম্পদের মালিক। তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী হয়েও হাসপাতালের প্যাথলজিতে পরীক্ষার ফিসের টাকা সরকারি খাতে কম দেখিয়ে অসাধু উপায়ে তিনি এই টাকা উপার্জন করেছেন বলে অভিযোগ। একই সাথে হাসপাতাল থেকে প্যাথলজির মেডিসিন গায়েব করে দিয়ে নিজস্ব প্রতিষ্ঠানে প্যাথলজির কাজ করেন। দীর্ঘ ২৭ বছর ধরে একই কর্মস্থলে চাকরি করার সুবাদে ধরাকে সরা জ্ঞান করে দেদারছে দুর্নীতি চালিয়ে গেলেও রহস্যজনক কারণে কর্তৃপক্ষ নিরব ভূমিকা পালন করছেন বলেও অভিযোগ এসেছে। হাতেনাতে দুর্নীতি ধরা পড়ার খবর গ্রামের কাগজে প্রকাশিত হলে মঙ্গলবার এলাকায় ব্যাপক তোলপাড়ের সৃষ্টি হয়। এ ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের টনক নড়েছে। দুর্নীতির বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য মঙ্গলবার তিন সদস্য বিশিষ্ট টিম গঠন করা হয়েছে। তিন কার্যদিবসের মধ্যে ওই কমিটি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিবেন বলে হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে।
সূত্র জানিয়েছে, ল্যাব টেকনোলজিস্ট সামসুর রহমান হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগটি দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করেছেন। একচেটিয়াভাবে অনিয়ম ও দুর্নীতির স্বর্গে পরিণত করেন তিনি। এই প্যাথলজি থেকে আন্তঃ ও বহির বিভাগের শতশত রোগী বিভিন্ন পরীক্ষা করান। সরকারী নির্ধারিত মূল্যে এই পরীক্ষা করা হয়। রোগীর নিকট থেকে প্রাপ্ত  নির্ধারিত ফিসের টাকা সোনালী ব্যাংক চৌগাছার শাখার অনুকূলে একাউন্টের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা হয়।
সূত্র জানায়, প্রতিমাসের ২ ও ১৫ তারিখে হাসপাতালের সরকারি আয়কৃত টাকা জমা দেন আলামিন নামে এক কর্মচারী। হাসপাতাল সূত্র জানায়, প্যাথলজি থেকে যে টাকা আয় হয় তার হিসাব করা হয় রশিদ বইয়ের মুড়িবই ও রেজিস্টার থেকে। মুড়ি বইতে বিভিন্ন পরীক্ষা বাবদ টাকার অংক লেখা থাকে। সেই হিসাবে করেই আয়ের হিসাবটি মিলিয়ে নেয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে এর অন্তরালে রয়েছে শুভঙ্করের ফাঁকি।
একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, মুড়িবইয়ের সাথে রেজিস্টারের কোন মিল নেই। ল্যাব টেকনোলজিস্ট সামসুর রহমান সরকারি টাকা আত্মসাত করার জন্য নানা কৌশল অবলম্বন করেন। রোগীর পরীক্ষা ফি বাবদ রশিদ দেয়া হলেও তাৎক্ষণিকভাবে রশিদের বাম পাশের মুড়িতে কোন তথ্যই লেখেন না তিনি। মুড়িগুলো আলাদাভাবে রেখে দিয়ে ফ্রি সময়ে তিনি নিজের ইচ্ছেমত ২০/৩০ টাকা ও রোগীর নাম লিখে রাখেন। হাতেনাতে দুর্নীতি অনিয়ম ধরা পড়ার সময় কয়েকটি মুড়ি বই যাচাই করে দেখা গেছে প্রতিটি মুড়ি বইতে পরীক্ষার টাকা লেখা রয়েছে ২০ থেকে ৩০ টাকা। এখন সাধারণে প্রশ্ন হলো প্রত্যেক রোগীই কি একই ধরনের পরীক্ষা করেছেন? অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, পরীক্ষা করতে এইসবি-৩০ টাকা, ইএসআর-৩০ টাকা, ব্লাড ফর এমপি-২০ টাকা, ইউরিন আর/ই-২০ টাকা, স্টল আর/ই-২০ টাকা ধার্য রয়েছে। মুড়ি বই অনুযায়ী অধিকাংশ রোগীই কি একইভাবে উল্লেখিত পরীক্ষাই করে থাকেন। এছাড়া ৫০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত নানান পরীক্ষা রয়েছে। অথচ এই পরিমাণ টাকার পরীক্ষার তথ্য বা টাকার পরিমাণ মুড়ি বইতে তেমন লেখা নেই। মুড়ি বইয়ের শুভঙ্কর ফাঁকির মাধ্যমে প্রতিমাসেই তিনি এক থেকে দেড় লাখ টাকা আত্মসাত করছেন। এছাড়া হাসপাতাল থেকে প্যাথলজির মেডিসিন গায়েব করে দিয়ে নিজস্ব প্রতিষ্ঠানে প্যাথলজির কাজ করে চলেছেন বলেও গুরুতর অভিযোগ বিদ্যমান।
তথ্যসূত্রের ধারণা মতে, প্রতি মাসে গড়ে ১ লাখ টাকা আত্মসাত করলে তিনি দীর্ঘ ২৭ বছরে দুর্নীতি করে অবৈধ টাকার পাহাড় গড়েছেন। ধারণা সূচককারী তথ্যদাতা দাবি করেন আনুমানিক ধারণা করে এই হিসাব করলেও বাস্তবে দূর্নীতির টাকার পরিমাণ আরো বেশি। সূত্র জানায়, বিগত ২৭ বছরে তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী হিসাবে তার বেতন সর্বচ্চ ১৭ লাখ টাকা হতে পারে। ১৯৯০ সালে প্রথমে চাকরিতে যোগদান করলে তার ২৮০০ টাকার স্কেলে বেতন ছিল। পর্যায়ক্রমে তা বেড়ে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ৫৬’শ টাকা স্কেলে দাঁড়ায়।
মণিরামপুর উপজেলার রোহিতা ইউনিয়নের সালামতপুর গ্রামের পৈত্রিকনিবাস থেকে তিনি ২ থেকে আড়াই বিঘা জমি পেয়েছেন বলে এলাকাবাসী সূত্র নিশ্চিত করেছে। অথচ দুর্নীতিগ্রস্ত ল্যাব টেকনোলজিস্ট সামসুর রহমান এখন কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক। তৃতীয় শ্রেণির এই কর্মচারীর বিভিন্ন তথ্যসূত্রে মুটামুটি সম্পদের হিসাব পাওয়া গেছে। একাধিক সূত্র জানিয়েছে, চৌগাছার সর্বোচ্চ বসবাসযোগ্য নিরিবিলি পাড়াতে পাঁচ শতক জমির মূল্যসহ প্রায় কোটি টাকার একটি আলিশান বাড়ি আছে। এছাড়া চৌগাছা পৌর সদরে কয়েক স্থানে তার ক্রয়কৃত জমি রয়েছে। যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ৩০ লাখ টাকা। বিগত চার বছর আগে তার বড় পুত্র সন্তানকে বে-সরকারি মেডিকেলে ২২ লাখ টাকা দিয়ে ভর্তি করেন বলে তার প্রতিবেশীরা জানান।
এদিকে হাতেনাতে দুর্নীতি ধরা পড়ার খবর গ্রামের কাগজে প্রকাশিত হলে মঙ্গলবার এলাকায় ব্যাপক তোলপাড়ের সৃষ্টি হয়। দুর্নীতিবাজ সামসুর রহমান বেসামাল হয়ে পড়েন। তিনি বিভিন্ন মহলে ধর্ণা দিয়ে নিউজ প্রকাশ না করার জন্য দেনদরবার চালিয়ে যান। অনেকে এ প্রতিনিধির কাছে ফোন দিয়ে নিউজ না করার জন্য বলেন। মঙ্গলবার সংবাদটি প্রকাশিত হলে চৌগাছা বাজারসহ হাসপাতাল এলাকায় ব্যাপক আলোচনা সমালোচনা শুরু হয়।
মঙ্গলবার আবাসিক মেডিকেল অফিসারকে প্রধান করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
উপজেলা হাসপাতালের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ সেলিনা বেগম জানান, এ বিষয়ে আমরা তিন সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। তিন কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দেবার কথা বলা হয়েছে। আমরা মডেল হাসপাতালে কোন অনিয়ম ও দুর্নীতি সহ্য করব না। যারা অনিয়মের সাথে যুক্ত হবে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। 



সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : gramerka@gmail.com, editor@gramerkagoj.com
Design and Developed by i2soft