দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল
বর্নাঢ্য আয়োজনে যশোর মুক্ত দিবস উদযাপন
মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উন্নত দেশ গড়ার প্রত্যয়
কাগজ সংবাদ :
Published : Thursday, 7 December, 2017 at 5:17 AM
মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উন্নত দেশ গড়ার প্রত্যয়ডিসেম্বর বিজয়ের মাস। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলার ইতিহাসে রচিত হয়েছিল বীরত্বের অমর গাঁথা। পাকিস্তানী দখলদার বাহিনীকে হটিয়ে দিয়ে বাঙলা মায়ের পায়ের শৃংখল খুলে দিয়েছিল বাংলা মায়ের দামাল ছেলেরা। ছিনিয়ে এনেছিল রক্ত¯œাত বিজয়। ১৬ ডিসেম্বর গোটা দেশ স্বাধীন হলেও যশোর স্বাধীন হয়েছিল ৬ ডিসেম্বর। ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর পাক হানাদার বাহিনী মুক্ত হয়েছিল যশোর জেলা। এইদিনে  যশোর সেনানিবাস ছেড়ে পালিয়ে যায় পাক হানাদার বাহিনী। স্বাধীন যশোরের মুক্ত আকাশে পতপত করে উড়েছিল লাল সবুজের পতাকা। মুক্তিযুদ্ধের সময়ের বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স (বিএলএফ) মুজিব বাহিনীর বৃহত্তর যশোর জেলার (যশোর, ঝিনাইদহ, মাগুরা ও নড়াইল) প্রধান ছিলেন বীরযোদ্ধা আলী হোসেন মনি এবং ডেপুটি প্রধান ছিলেন রবিউল আলম। যশোর মুক্ত দিবসে সেই স্মৃতি আবার ক্ষণিকের তরে গতকাল ফিরে এসেছিল টাউন হল ময়দানে। যশোর জেলা প্রশাসনের আয়োজনে উদযাপিত ঐতিহাসিক যশোরমুক্ত দিবসের বর্ণাঢ্য আয়োজনে।
রওশন আলী মঞ্চে সকাল সাড়ে আটটা থেকে যশোর সম্মিলিত সাংষ্কৃতিক জোটের শিল্পীদের পরিবেশনায় দেশাত্মবোধক সঙ্গীতে ছিল রক্তের উষ্ণতা বেড়ে দূর করে দিয়েছিল শীতের সকালের হিম হিম ভাবকে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সুসজ্জিত শোভাযাত্রা একে একে যুক্ত হচ্ছিল টাউন হল ময়দানে। চোখে পড়ার মত ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের উপস্থিতি। একাত্তরের ছয় ডিসেম্বরের মতোই। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উন্নত দেশ গড়ার প্রত্যয়
গতকালও মাঠে উপস্থিত ছিলেন যশোর মুক্ত দিবসের মহানায়ক মুক্তিযোদ্ধা আলী হোসেন মনি, রবিউল আলম, রাজেক আহমেদ, অশোক কুমার রায় সহ আরো অনেকে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উন্নত দেশ গড়ার প্রত্যয়
সকাল সাড়ে ৯টায় শোভাযাত্রার উদ্বোধন করেন যশোর জেলা প্রশাসক মোঃ আশরাফ উদ্দীন। এ সময় তিনি বলেন যশোর অনেক কিছুতেই প্রথম। অবিভিক্ত বাংলার প্রথম জেলা, দেশের প্রথম হানাদারমুক্ত জেলা, দেশের প্রথম ডিজিটাল জেলা। আমাদের সামনে এখন একুশ সালের মধ্যম আয়ের দেশ আর একচল্লিশ সালের উন্নত দেশ গড়ার প্রত্যয়। মহান বিজয়ের মাসে সবারই দৃপ্ত শপথ হোক উন্নয়নের মহাসড়কে দূর্বার গতিতে এগিয়ে চলা দেশকে সামনে এগিয়ে নেবার যুদ্ধে স্বক্রিয় অংশগ্রহণ করা। সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আগামী প্রজন্মের জন্য উন্নত দেশ গড়া।  
এরপর টাউন হল মাঠের শতাব্দী বটমূলে রওশন আলী মঞ্চে হাজারো কণ্ঠে পরিবেশিত হয় জাতীয় সংগীত হয়। এরপর বাদ্যের তালে তালে বেলুন ফেস্টুন উড়িয়ে জাতীয় পতাকা শোভিত বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক  মোঃ আশরাফ উদ্দিন।
শোভাযাত্রায় যশোর জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সাইফুজ্জামান পিকুল, প্রবীণ শিক্ষক তারাপদ দাস, জাসদের কার্যকরী সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা রবিউল আলম, একাত্তরের বৃহত্তর যশোরের মুজিব বাহিনীর কমান্ডার আলী হোসেন মনি, মুক্তিযোদ্ধা অশোক কুমার রায়, রাজেক আহমেদ, আবুল হোসেন, এএইচএম মুযহারুল ইসলাম মন্টু, মোহাম্মদ আলী স্বপন, আফজাল হোসেন দোদুল, যশোর সংবাদপত্র পরিষদের সভাপতি একরাম-উদ- দ্দৌলা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উন্নত দেশ গড়ার প্রত্যয়অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) হুসাইন শওকত, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক(শিক্ষা ও আইসিটি) দেবপ্রসাদ পাল, এনডিসি আরিফুর রহমান, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির পলিট ব্যুরো সদস্য ইকবাল কবির জাহিদ, জেলা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি ডিএম শাহিদুজ্জামান, জেলা শিল্পকলা একাডেমির সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট মাহমুদ হাসান বুলু সহ যশোরের মুক্তিযোদ্ধা, বিভিন্ন সরকারি  বেসরকারি কর্মকর্তা, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক শিক্ষার্থীসহ সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের সদস্যসহ যশোরের বিশিষ্ট জনেরা অংশগ্রহণ করেন।
যশোর মুক্ত দিবসের স্মৃতি চারণ করে মুক্তিযোদ্ধা অশোক কুমার রায় বলেন, বনগাঁ জয়পুরে অবস্থিত বিএলএফ মুজিব বাহিনীর ইনডাকশন ক্যাম্পের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ছিলেন বর্তমান বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমদের সাথে তিনি যুক্ত ছিলেন। প্রশিক্ষণে নিতে আসা মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যারাকপুর ক্যান্টনমেন্টে প্রশিক্ষণে যুক্ত করা এবং প্রশিক্ষণ প্রাপ্তদের সেখান থেকে দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করানোর সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করতেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উন্নত দেশ গড়ার প্রত্যয়১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর বনগাঁ থেকে তোফায়েল আহমেদ, নূর আলম জিকু, শাহ হাদীউজ্জামান,অশোক কুমার রায়, সালেহা বেগম, তৎকালীন যশোর জেলা প্রশাসক ওয়ালীউল ইসলাম সহ চৌগাছা সীমান্ত দিয়ে সন্ধ্যায় যশোর আসেন। প্রয়াত আলী রেজা রাজু তাদের নিজ বাড়ীতে আপ্যায়ন করেন। স্বাধীন দেশে সে এক অন্যরকম সন্ধ্যা। অন্যরকম অনুভূতি যা ভাষায় ব্যক্ত করা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স (বিএলএফ) মুজিব বাহিনীর উপ প্রধান মুক্তিযোদ্ধা রবিউল আলম বলেন, দেশের জন্য রক্ত দেব প্রয়োজনে জীবনও দেব এটাই ছিল শপথ। বেঁচে থাকবো সেটা তখন ভাবিনি। ৬ ডিসেম্বর দুপুরের আগেই যশোর খাজুরা মহাসড়ক ধরে তার নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা যশোরে সমাবেত হন। অন্য অংশ থেকেও দলে দলে মুক্তিযোদ্ধারা যশোর আসেন। যশোরের সাধারণ মানুষ অনেকেই বুঝে উঠতে পারেননি যশোর শত্রুমুক্ত হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা আর মিত্রবাহিনীর আগমনে আস্তে আস্তে ঘর ছেড়ে বাইরে বের হতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উন্নত দেশ গড়ার প্রত্যয়থাকেন যশোরবাসী। আবেগ আপ্লুত যশোরবাসী মুক্তিযোদ্ধাদের বুৃকে জড়িয়ে নেন। জয়বাংলা স্লোগানে মুখরিত হতে থাকে যশোর। আনন্দে অনেকে মিত্রবাহিনীর ট্যাংকের উপর উঠে উল্লাস প্রকাশ করেন। সে এক অবিস্মরণীয় ঘটনা। ঘরে না ফেরার প্রত্যয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধে গিয়ে বিজয়ীর বেশে ফিরে আসা সৌভাগ্যের ব্যাপার। বেঁচে আছি বলেই চাওয়া আর পাওয়ার হিসাব মেলানোর সুযোগ পাচ্ছি। মুক্তিযুদ্ধ একটি গণতান্ত্রিক লড়াই। উন্নত, অসাম্প্রদায়িক, রাজনৈতিক, সংষ্কৃতির লড়াই। শোষণ নিপীড়ন থেকে মুক্তির জন্য জনগণের লড়াই। ১৯৭২ সালের সংবিধানে জনগণের অধিকার ও অর্থনৈতিক সমতার কথা বলা হলেও বৈষম্য ক্রমাগত বাড়ছে। সম্পদ গুটি কতক লোকের কাছে কুক্ষীগত হয়ে যাচ্ছে। অর্থনীতির এই রুপটি মুক্তিযুদ্ধের পরিপন্থী।
বর্নিল শোভাযাত্রা মুজিব সড়ক, দড়াটানা হয়ে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র সড়ক হয়ে চৌরাস্তা রবীন্দ্রনাথ সড়ক হয়ে বিজয় স্তম্ভে এসে শেষ হয়। সেখানে জেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। এসময়  মুক্তিযোদ্ধাদের জয়বাংলা স্লোগানে মুখরিত হয় বিজয় স্তম্ভ চত্বর।
যশোর মুক্ত দিবস বর্ণাঢ্য উদযাপনের জন্য জেলা প্রশাসনের আয়োজনকে সাধুবাদ জানান শোভাযাত্রায় আগত সুধীজনেরা। তবে যারা যশোরমুক্ত দিবসের জীবন্ত কিংবদন্তী তাঁদের উল্লেখযোগ্যরা মাঠে উপস্থিত থাকা সত্বেও তাঁদের নাম ঘোষণা না করা, তাঁদের নুন্যতম সম্মান প্রদর্শন না করা আর জাতীয় সংগীতের সময় মঞ্চে বীরমুক্তিযোদ্ধাদের ডিঙিয়ে ফটো সেশনে অন্যদের অতিআগ্রহ দৃষ্টিকটু ছিল বলে অনেকেই মন্তব্য করেন। যাদের জন্য আয়োজন তাদের মঞ্চে না ডাকায় মাঠে উপস্থিত অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন।



সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : gramerka@gmail.com, editor@gramerkagoj.com
Design and Developed by i2soft