বুধবার, ১৭ জুলাই, ২০১৯
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল
যশোরে মাতৃত্বকাল ভাতা বিতরণ
শর্তের বেপরোয়া লঙ্ঘন পদে পদে দুর্নীতি
দেওয়ান মোর্শেদ আলম
Published : Thursday, 6 December, 2018 at 1:50 AM
শর্তের বেপরোয়া লঙ্ঘন পদে পদে দুর্নীতিবেনাপোল ইউনিয়নের নারায়নপুর গ্রামের আলাউদ্দিনের বাড়ি গিয়ে বিস্মিত হতে হয় গ্রামের কাগজ অনুসন্ধানী দলকে। সরকারি শর্ত অনুযায়ী, সর্বোচ্চ দুই সন্তানের মা, এই ভাতা পাবেন। কিন্তু রেশমা খাতুন চার মেয়ের মা হয়েও ভাতা পেয়েছেন। চার কাঠা জমির উপর তাদের একতলা পাকা বাড়ি। বছর দেড়েক আগে তাঁর বড় মেয়েরও বিয়ে হয়ে গেছে। তালিকায় নিজের নাম কিভাবে ওঠালেন? রেশমার পরিষ্কার জবাব- স্থানীয় মহিলা মেম্বার তাকে ভাতা কার্ড করে দিয়েছেন।
দরিদ্র মা’র জন্য মাতৃত্বকাল ভাতা কর্মসূচি নীতিমালায় সুবিধাভোগী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে পাঁচটি শর্তকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বলা হয়েছে, এই ভাতা পাওয়া যাবে কেবলমাত্র প্রথম বা দ্বিতীয় গর্ভধারণের সময়। মা’র বয়স হতে হবে ২০ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে এবং অর্থবছরের জুলাই মাসে অবশ্যই গর্ভবতী থাকতে হবে। প্রমাণ হিসেবে জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্ম নিবন্ধন এবং ডাক্তারি সনদকেও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এসব শর্তের একটিও লঙ্ঘন হলে সংশ্লিষ্ট মা ভাতা পাওয়ার ক্ষেত্রে অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন।
কিন্তু যশোরে সুবিধাভোগী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে বেপরোয়াভাবে লঙ্ঘন করা হয়েছে সরকারি নির্দেশনা। গ্রামের কাগজের জরিপ ফলাফল অনুযায়ী, জেলায় ভাতাভোগীদের ২৮ শতাংশই অযোগ্য। কারণ তারা অন্তত একটি বাধ্যতামূলক শর্ত লঙ্ঘন করেছেন। এই হার সবচেয়ে বেশি শার্শা ও ঝিকরগাছায়। এখানে প্রতি পাঁচ জনে দুই জনই নীতিমালা অনুযায়ী অযোগ্য। আর অভয়নগরে বাধ্যতামুলক শর্ত মানা হয়নি ভাতাভোগীদের এক তৃতীয়াংশের ক্ষেত্রে।
যাদের ভাতা পাওয়ার কথা নয়, তাদের নাম তালিকায় উঠাতে গিয়ে পদে পদে হয়েছে দুর্নীতি। অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, কীভাবে স্থানীয় প্রভাবশালী, ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য ও চেয়ারম্যানরা কখনো টাকার বিনিময়ে কখনোবা স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে শর্ত লঙ্ঘন করে দুইয়ের অধিক শিশুর মা, নির্ধারিত সীমার অল্প বা বেশী বয়সী নারী এবং ধনী পরিবারের সদস্যদের ভাতা পাইয়ে দিয়েছেন।
যে ৪০৪ জনের সাক্ষাতকার নেয়া হয়েছে তাদের ৪১ ভাগই বলেছেন, তালিকায় নাম উঠাতে তাদের স্থানীয় প্রভাবশালী, বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদের লোক বা সদস্যদের কাছে তদবির করতে হয়েছে। এদের মধ্যে ৬৮ জন মা বলেছেন, তারা ভাতা পেতে কাউকে না কাউকে টাকা দিয়েছেন, একেকজন গড়ে ৭৮৯ টাকা হারে। জরিপের পর বিষয়টি নিয়ে সরেজমিন অনুসন্ধান করেছেন গ্রামের কাগজের প্রতিবেদকরা। আলাদা ভাবে কথা বলেছেন ভুক্তভোগী, অযোগ্য ভাতাভোগী, অভিযুক্ত ব্যক্তি এবং তদারকির কাজে নিয়োজিত সব পক্ষের সাথে।
বাধ্যতামূলক শর্ত লঙ্ঘন
শার্শার বেনাপোল ইউনিয়নের পোড়াবাড়ি গ্রামের আবু তালেবের স্ত্রী ফুলজান খাতুন ও কাগমারী গ্রামের আরিজুলের স্ত্রী তাসলিমা খাতুন। অনুসন্ধান যখন চলছিল তখন তাদের একজনের বয়স ৩৭ এবং আরেকজনের ৩৮ বছর। দুজনই ভাতা পাচ্ছেন। অথচ বয়স ৩৫-এর বেশী হলে মাতৃত্বকালীন ভাতা পাওয়ার কথা নয়।
বড়আঁচড়া গ্রামের মাসুম বিল্লাহর স্ত্রী আলমিনা খাতুন রয়েছেন তালিকার ৬১ নম্বরে। তাঁর জন্ম তারিখ ৮ জানুয়ারি, ১৯৯৭। সেই হিসেবে ২০১৬ সালের জুলাইয়ে তার বয়স ছিল ২০-এর নিচে। কিন্তু ভাতা পেতে অসুবিধা হয়নি তার।
সাক্ষাৎকার নেয়া ৪০৪ জন মায়ের মধ্যে ২৪ জনের বয়সই ২০ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে নয়, কিন্তু তারা ভাতা পাচ্ছেন। এদের কারোর জন্মনিবন্ধন, কারোবা জাতীয় পরিচয়পত্রের মাধ্যমে বয়স নিশ্চিত করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও এসেছে ৪ সন্তানের মা ভাতাভোগী হয়েছেন ঝিকরগাছা ও শার্শায়। ঝিকরগাছার হাজিরবাগ ইউনিয়নের ধল্লা (ন’পাড়া) গ্রামের রফিকুলের স্ত্রী মনোয়ারা খাতুন। তিনি ৪ সন্তানের মা। তার বড় ছেলেরই সাড়ে ৪ বছরের একটা মেয়ে রয়েছে। কিন্তু তিনি ভাতা পাচ্ছেন। জরিপে গোটা জেলায় ৩৩ জন ভাতাভোগী পাওয়া গেছে যারা তিন সন্তানের মা।
অনেক ক্ষেত্রে মানা হয়নি গর্ভধারণ বিধিও। নীতিমালায় “ছ’ শর্তে বলা হয়, উপকারভোগী নির্বাচনের সময় অর্থাৎ জুলাই মাসে উপকারভোগীকে অবশ্যই গর্ভবতী থাকতে হবে। সেই হিসেবে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে যারা ভাতাভোগী হয়েছেন তাদের অক্টোবর ২০১৫ থেকে জুলাই ২০১৬ সময়ের মধ্যে গর্ভধারণ করার কথা। কিন্তু জরিপে দেখা যায়, ৪০৪ জনের মধ্যে ৫০ জনেরই গর্ভধারণ এই সময়ের আগে বা পরে। জরিপে এমন ৫জন মা’ও পাওয়া গেছে, যারা সবগুলো আবশ্যিক শর্ত লংঘনের পরও ভাতা ভোগ করছেন।
দুর্নীতি ও অনিয়ম
শার্শার বেনাপোল ইউনিয়নে ভাতাবাণিজ্য করেছেন রশিদ নামে একব্যক্তি। তিনি ইউনিয়ন পরিষদের কেউ না। ভাতা কমিটিতেও নাম নেই। কিন্তু চেয়ারম্যানের ‘খাস’ লোক হিসেবে পরিচিত এই আব্দুর রশিদ করেছেন বেপরোয়া ভাতাবানিজ্য। মাসিক ৫ শ টাকার ভাতা। ছয় মাসে মোট তিন হাজার টাকা। দরিদ্র মায়েদের এই অর্থেও তিনি ভাগ বসিয়েছেন। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, তিনি একেকটি কার্ডে দুশো থেকে শুরু করে এক হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ নিয়েছেন।
শার্শার বেনাপোল ইউনিয়নের তাছলিমা খাতুনের নাম ভাতাভোগীর তালিকায় ৯ নম্বরে। স্বামী নারায়নপুর বাওড়কান্দার আসাদুজ্জামান। ১৬ শতক জায়গায় বসতবাড়ি। মাঠে আছে আরো চার বিঘা। এক ননদের স্বামী রওনকের মাধ্যমে তালিকাভুক্ত হন তাছলিমা। তিনি জানান, ইউনিয়ন পরিষদের ‘খাস লোক’ রশিদকে এক হাজার টাকা দিয়ে নাম লিখিয়েছেন। গেল মার্চে দু’কিস্তিতে ভাতার ছয় হাজার টাকা তুলেও নিয়েছেন।
এ বিষয়ে আব্দুর রশিদের বক্তব্য জানতে চাওয়া হলে তিনি অনিয়মের সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। গ্রামের কাগজ প্রতিবেদককে বলেন, “আমি ইউনিয়ন পরিষদে টুকটাক আসা-যাওয়া করি। চেয়ারম্যানের কাজে সহায়তা করি। কিন্তু কোন অনিয়ম বা দুর্নীতি করিনা।”
একই ইউনিয়নের পোড়াবাড়ি গ্রামের আব্দুল করিমের স্ত্রী লাইলী খাতুন তিন মেয়ের মা হয়েও তালিকায় জায়গা পেয়ে গেছেন। বসতবাড়ি ১০ কাঠা জমির। মাঠে আছে আরো চার বিঘার মতো। ইউপি চেয়ারম্যানের খুবই কাছের লোক পোড়াবাড়ির আইয়ুবের মাধ্যমে তিনি তালিকায় নাম তোলেন বলে জানা যায়।
ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বজলুর রহমানের খুবই ঘনিষ্ট হিসেবে পরিচিত আইয়ূব। এ কারণে মেম্বরদের চেয়েও ‘দাম’ বেশি তার। তালিকায় আইয়ুব কয়েকজনের নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন-তাদের দু’জন আবু তালেবের স্ত্রী ফুলজান খাতুন ও আব্দুল করিমের স্ত্রী লাইলী খাতুন। দু’জনেরই নামের পাশে আইয়ুবের নিজের নম্বরটি দেয়া। অথচ ফুলজান ও লাইলী দু’জনেরই নিজের মোবাইল ফোন রয়েছে।
এব্যাপারে চেয়ারম্যান বজলুর রহমান জানান, সরকারি প্রকল্পে একটু আধটু এদিক ওদিক হয়েই থাকে। আব্দুর রশিদ ও আইউব তার খাস লোক নয়, তবে তাকে চেনেন। ভাগা না পেয়ে কোনো মেম্বার তার বিরুদ্ধে মিথ্যা কথা বলতে পারে।
ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যদের নামেও অভিযোগ বিস্তর। ইউনিয়নের ডুমদিয়া গ্রামের বাসিন্দা ছমির উদ্দিনের স্ত্রী জামেনা বেগম। তার অভিযোগ, মহিলা মেম্বার রেশমা ভাতা কার্ড করাতে দুই হাজার টাকা করে নিয়েছেন।
গয়ড়া দক্ষিণ গ্রামের বাসিন্দা শারমিন আক্তার। স্বামী জিনারুল ইসলাম। চার কাঠা জমির উপর একতলা পাকা বাড়ি। মাঠে পাঁচ বিঘার মতো জমি। আছে অনেকগুলো গরুও। এলাকার সাবেক মেম্বর রায়হানের মাধ্যমে শারমিন এই ভাতা পাচ্ছেন। কার্ড নেয়ার সময় চৌকিদার নবীছ উদ্দিনকে দিতে হয়েছে ৫০ টাকা। আর রায়হান মেম্বার নিজে নিয়েছেন পাঁচশ’। এ মেম্বারের বিরুদ্ধে ঘুষ নেয়ার আরো কিছু অভিযোগ পাওয়া যায় সরেজমিন অনুসন্ধানে।
তবে রায়হান মেম্বার বলেছেন, তিনি কারো কাছ থেকে কোন টাকা নেননি। মানবিক কারণে তাদের উপকার করেছেন। তাদের অনেকেই তার নিকটাত্মীয় বলে স্বীকারও করেন রায়হান।
যশোর সদর উপজেলার কাশিমপুর ইউনিয়নের ৯ নাম্বার ওয়ার্ডের মহিলা সদস্য ফরিদা বেগম। ওই গ্রামের আসলাম আলীর স্ত্রী নাছিমার অভিযোগ, তার কাছ থেকে ২ হাজার টাকা ঘুষ নিয়েছেন ফরিদা।
ইউনিয়ন পরিষদের লোককে ঘুষ দেয়ার- এমন অনেক উদাহরণ ও প্রমাণ গ্রামের কাগজ দপ্তরে আছে। এব্যাপারে মহিলা মেম্বার ফরিদা বেগম জানান, তিনি কারো কাছ থেকে টাকা নেননি। নিজের লোকজনকে তিনি ভাতা কার্ড দিয়েছেন। কাজেই টাকা নেয়ার প্রশ্নই ওঠেনা। তার সুনাম নষ্ট করে কারো দ্বারা প্ররোচিত হয়ে কেউ তার বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করতে পারে।
ইউনিয়ন পরিষদের স্বচ্ছতার অভাবে ভাতাভোগীদের ভোগান্তি ও আর্থিক ক্ষতি দুটোই হয়েছে। প্রতি মাসে ৫শ টাকা করে পাননি এমন ভাতাভোগী শতকরা ৬.৭ জন। তালিকায় নাম থাকলেও টাকা পাননি চৌগাছায় ১৬.৭ শতাংশ। ওয়ার্ড মেম্বার টাকা কম দিয়েছেন এমন চিত্র সদরে ১৬.৭ শতাংশ।
ব্যাংক একাউন্ট বাধ্যতামূলক হলেও শতকরা ১৫ শতাংশ ভাতাভোগী জানেনা তাদের একাউন্ট আছে কিনা। ভাতাভোগী অন্যের একাউন্ট থেকে টাকা উত্তোলন করেন এমন প্রমাণও মিলেছে কয়েকটি ইউনিয়নে। এমনকি চৌগাছার সুখপুকুরিয়ায় ভাতাভোগী মায়ের তালিকায় ঢুকে পড়েছেন কামাল হোসেন নামে একজন পুরুষও। ভাতা বিতরণে ব্যাংকের অনিয়ম নিয়ে আলাদা অনুসন্ধানে এই ঘটনার বিস্তারিত রয়েছে।
জরিপে দুর্নীতি ও অনিয়মের এমন নজির উঠে এসেছে যশোরের সব উপজেলায়। ফলাফলে দেখা গেছে, ৪০ শতাংশ মা’কে ভাতার জন্য তদবির করতে হয়েছে এবং তার বেশীরভাগই ইউনিয়ন পরিষদের লোকের কাছে। যারা ঘুষ দাতাদের একেকজনকে কেশবপুরে গড়ে ১৭৫০ টাকা, মণিরামপুরে ১২৭২ টাকা ও সদরে ৯২৩ টাকা খরচ করতে হয়েছে। গোটা জেলায় ঘুষের মাথাপিছু গড় হার ছিল ৭৯০ টাকা।
সবখানেই স্বজনপ্রীতি
চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের কাছের লোক ও পারিবারিক সম্পর্ক থাকায় ধনাঢ্য পরিবারের মেয়ে-বউয়েরাও দরিদ্র মায়ের ভাতা পাচ্ছেন- এমন চিত্র উঠে এসেছে কম বেশী সব উপজেলায়। যেমন, যশোর সদরের কনেজপুর গ্রামের মেয়ে নুর নাহার। পিতা মুক্তিযোদ্ধা। স্বামী সেনাবাহিনীতে চাকরি করেন। সেনা কোড অনুযায়ী পরিবারটি সরকারি সকল সুযোগ সুবিধা ভোগ করেন। তবু তিনি ভাতাভোগী হয়েছেন।
এলাকার সমাজকর্মী সোহাগ আহমেদ বলেন, চেয়ারম্যানের সাথে ওই পরিবারের পারিবারিক সম্পর্ক আছে। এলাকার সংবাদ কর্মী মোফাজ্জেল হোসেনও বলেন, স্বজনপ্রীতি করেই নুর নাহারেরর ভাতা কার্ড করে দেয়া হয়েছে। এব্যাপারে বক্তব্য নেয়া হলে নুর নাহারের পিতা মুক্তিযোদ্ধা রকিব উদ্দিন জানান, তার জামাই সেনা বাহিনীতে চাকরি করলেও মেয়ে ভাতা ভোগী হওয়ার সময় বেতন পেত না। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে এলাকায় তার যথেষ্ট সম্মান রয়েছে। তাকে সম্মান করে তার মেয়েকে ভাতার তালিকায় এনেছে ভাতা কমিটি।
এ ব্যাপারে যশোর সদর উপজেলার কাশিমপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মশিয়ার রহমান সাগর জানান, তার ইউনিয়নে কোনো বিধি ভুলুণ্ঠিত হয়নি। উপজেলা নিবার্হী কর্মকর্তার সাথে সমন্বয় করে ভাতা কমিটি করা হয়েছে। সকল কাজপত্র উপজেলায় জমা আছে। তিনি নিজে স্বজনপ্রীতির সাথে জড়িত নন। কারো কাছ থেকে অর্থ নেয়ার ঘটনা তার জানা নেই।
আর ভাসুর রাজনৈতিক নেতা হওয়ায় ভাতাভোগী হয়েছেন সলুয়া গ্রামের হাসানুর রহমানের স্ত্রী সামিয়া বেগম। সামিয়া ভাতাভোগীর তালিকার ক্রমিক নম্বর ৩৩-এ আছেন। তার ভাসুর আব্দুস সালাম ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। ৩ কক্ষের ছাদের বাড়িতে স্বামী-সন্তান নিয়ে বসবাস করেন তিনি।
এ ব্যাপারে সামিয়ার শ্বশুর গোলাম রব্বানী জানিয়েছেন, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাকে সবাই সম্মান ও সমীহ করেন। তাই বলে সেই প্রভাব খাটিয়ে তিনি ভাতা করাবেন প্রশ্নই ওঠেনা। ইর্ষান্বিত হয়ে কেউ তাদের পরিবারের সম্মান নষ্ট করার চেষ্টা করছে। ভাতাভোগী হওয়ার মতো বলে হয়তো বিবেচনায় ছেলের বউয়ের নাম তালিকায় উঠেছে।
আব্দুস সালাম জানান, তিনি বঙ্গবন্ধুর আর্দশে রাজনীতি করেন, কোনো সুবিধা পেতে নয়। তার প্রভাবে পরিবারের কেউ মাতৃত্বকাল ভাতা পেয়েছে এটাও সত্য নয়। কেউ তার নামে অযথা কথা রটাতে পারে।
চৌগাছার ধুলিয়ানী ইউনিয়নে বেরিয়ে এসেছে আরো অভিনব ঘটনা। এখানে তালিকায় ক্রমিক নম্বর ১৭- তে আছেন পাপিয়া খাতুন। স্বামীর নাম লেখা আছে ওযেদুর রহমান। গ্রাম ভাদড়া। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই ওযেদুর রহমান বিয়েই করেননি। তিনি পাপিয়া খাতুনের আপন ভাই।
এ ব্যাপারে ধুলিয়ানী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আতিয়ার রহমানের বক্তব্য নেয়া হয় তার ব্যক্তিগত মোবাইল নাম্বারে। তিনি গ্রামের কাগজকে জানান, তিনি কোনো অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির সাথে জড়িত নন। এই পরিবারের সাথে তার কোন আত্মীয়তা নেই। ভাতাভোগী বাছাইয়ের দায়িত্ব দিয়েছিলেন মেম্বারদের। ভাদড়া গ্রামের মেম্বার পান্নুর ঘনিষ্ট হচ্ছেন ওই ওযেদুর। যে কারণে ওই ভুলের জন্য পান্নুই দায়ি। যদিও অনুসন্ধানে দেখা যায়, চেয়ারম্যান আতিয়ার আসলে ভাতাভোগী পাপিয়ার বাবার ফুপাতো ভাই।
বাঘারপাড়া উপজেলার ধলগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য রেজাউল ইসলাম। তিনি দরিদ্র মা খুঁজতে গিয়ে প্রথমেই পেয়েছেন নিজের মেয়ে হিরা খাতুনকে। তার শশুরবাড়ি শালনগর, স্বামী কাজি ইমরান ঢাকার ধানমন্ডিতে কাপড়ের ব্যবসা করেন। হিরার কোন জাতীয় পরিচয়পত্রও নেই। মৌখিকভাবে জানিয়েছেন, তার জন্মতারিখ ৫ মে ২০০০। সেই হিসেবে বয়স ২০এর নীচে। তারপরও ভাতা পেতে কোন অসুবিধা হয়নি হিরার।
যশোর অভয়নগর উপজেলার প্রেমবাগ ইউনিয়নের ধলীরগাতি গ্রাম। তালিকায় নাম নেই, তবু এখানে ভাতাভোগ করছেন বাহারুল ইসলামের স্ত্রী দিলারা খাতুন। আড়াই বিঘা জমির উপর তাদের রয়েছে বিশাল অট্টালিকা। এলাকার সবাই জমিদার বাড়ি হিসেবে জানে এই বাড়িকে। প্রতিবেশীদের অভিযোগ, চেয়ারম্যান মফিজউদ্দিন তার এই আত্মীয়কে গরিবের টাকা পাওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।
তদারকিতে অস্বচ্ছতা
বিধিমালায় ভাতা বিতরণের কাজ বাস্তবায়ন ও তদারকির জন্য জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়নে আলাদা কমিটি গঠনের নির্দেশনা রয়েছে। অথচ সভাপতি সদস্য সচিব ঠিক রেখে অন্য সদস্যদের নাম বসিয়ে মনগড়া ভাতা কমিটি করা হয়েছে। বিধি মোতাবেক জেলা কমিটির বছরে দুটি আর উপজেলা কমিটির বছরে চারটি সভা করার কথা থাকলেও, তা মানা হয়নি।
অনুসন্ধানে এসেছে বেশিরভাগ ইউনিয়ন কমিটিতে ঘাপলা হয়েছে। অনুসন্ধান পরিচালনার সময় চেয়ারম্যান কিংবা সচিব, কোন কমিটির তালিকা দেখাতে পারেননি। তদারকিতে এমন দুর্বলতা ও অস্বচ্ছতার চিত্র আরো বিশদ ভাবে পাওয়া যাবে কমিটির কর্মকান্ড নিয়ে আলাদা অনুসন্ধানে।
মাতৃত্বকাল ভাতা বিতরণে এত অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে কথা হয় যশোরের জেলা প্রশাসক ও জেলা ভাতা কমিটির সভাপতি আব্দুল আওয়ালের সাথে। তিনি গ্রামের কাগজকে জানান, দরিদ্র মায়ের ভাতা নিয়ে অনিয়ম অসংগতি কিংবা দুর্নীতি খুবই দুঃখজনক। এটা গ্রহণযোগ্য নয়। এব্যাপারে তিনি অবশ্যই খোঁজখবর নেবেন এবং কার্যকরি ব্যবস্থা নেয়ার উদ্যোগ নেবেন।
এ ব্যাপারে যশোর জেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা সখিনা খাতুনের সাথে কথা হয়। তিনি গ্রামের কাগজকে জানান, ইউনিয়ন কমিটি ভাতাভোগী বাছাই করে নির্বাচিত করে উপজেলাতে পাঠায় আর উপজেলা কমিটি সব বাস্তবায়ন করে। শুধুমাত্র নামের তালিকা জেলা অফিসে আসে। এরপরও জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরে যদি কোনো লিকেজ থাকে, করণীয় থাকে সে ব্যাপারে কার্যকরি ব্যবস্থা নেবেন। আগামীতে অনিয়ম অসংগতি দূর করার চেষ্টা করবেন।




সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : gramerka@gmail.com, editor@gramerkagoj.com
Design and Developed by i2soft