মঙ্গলবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৯
আন্তর্জাতিক সংবাদ
তদন্তে ভয় পাই না : জাতিসংঘে মিয়ানমার
আন্তর্জাতিক ডেস্ক :
Published : Thursday, 10 October, 2019 at 4:27 PM
তদন্তে ভয় পাই না : জাতিসংঘে মিয়ানমারজাতিসংঘে মিয়ানমারের উপ-স্থায়ী প্রতিনিধি হ্যামওয়ে হ্যামওয়ে খেনি বলেছেন, মিয়ানমারের সম্মতি ও সহযোগিতা ছাড়া দেশটির সেনাবাহিনীর কর্তৃক মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদন্তে কোনও ফলপ্রসূ ফল পাবে না।
তিনি বলেছেন, ‘আমরা আন্তর্জাতিক ও জাতিসংঘের তদন্তকে ভয় পাই না। তবে মানবাধিকারের অজুহাতে বহু ভিত্তিহীন অভিযোগ দিয়ে মিয়ানমারের উপর অযৌক্তিক রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ করার একাধিক অন্যায্য ও নির্লজ্জ প্রচেষ্টা প্রত্যাখ্যান করা ছাড়া আমাদের ভিন্ন কোনো উপায়ও নেই।
হ্যামওয়ে হ্যামওয়ে খেনি বুধবার (৯ অক্টোবর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘের এক অধিবেশনে এসব মন্তব্য করেন।
আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘এই তদন্ত আরও কত বছর লাগবে তা আমরা জানি না।’
এদিকে মিয়ানমারে সেনাবাহিনীর কর্তৃক মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদন্তের পরিবর্তে বাংলাদেশে থেকে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবাসনে আরও বেশি অর্থ ব্যয় করার জন্য জাতিসংঘকে আহ্বান জানিয়েছে দেশটি।
মিয়ানমারের উপ-স্থায়ী প্রতিনিধি বলেন, অযথাই জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশন (এফএফএম) সহ মিয়ানমারের তদন্তকারী সাতটি সংস্থার জন্য ৩৫ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করছে। ২০২০ সালের প্রস্তাবিত বাজেটে ১৫ মিলিয়ন ডলার খরচ ধরা হয়েছে, যা সংস্থাটির আইনি বিষয়ে মোট ব্যয়ের প্রায় ২৬ শতাংশ।
গত মাসে এফএফএম তাদের নথিগুলো মিয়ানমারের জন্য স্বতন্ত্র তদন্তকারী মেকানিজমকে (আইআইএম) হস্তান্তর করেছিল। যা দিয়ে সেনাবাহিনী দ্বারা রাখাইন মুসলমানদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদন্ত কাজে ব্যবহৃত হবে।
জাতিসংঘ গঠিত স্বাধীন আন্তর্জাতিক ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন তাদের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনে দাবি করেছে যে, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী যত দিন আইনের ঊর্ধ্বে থাকবে তত দিন দেশটিতে শান্তি ফিরবে না।
এই মিশনের নেতৃত্বে ছিলেন ইন্দোনেশিয়ার সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল মারজুকি দারুসমান। সদস্য হিসেবে ছিলেন শ্রীলঙ্কার আইনজীবী নারী অধিকার বিশেষজ্ঞ রাধিকা কুমারস্বামী এবং অস্ট্রেলিয়ার সাবেক মানবাধিকার কমিশনার ও দেশটির আইন সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ক্রিস্টোফার ডমিনিক সিডোটি।
জাতিসংঘের মিয়ানমার বিষয়ক স্বাধীন আন্তর্জাতিক ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন জানিয়েছে, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মিয়ানমার সেনাবাহিনী গণহত্যা চালাতে চেয়েছিল কেননা মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশের রোহিঙ্গা মুসলমানরা ছিল ‘সুরক্ষিত জনগোষ্ঠী’। কিন্তু তাদের ওপর দেশটির সেনাবাহিনী হত্যা, শারীরিক অথবা মানসিক নিপীড়নসহ নিষিদ্ধ ঘোষিত সব ধরনের অপরাধ সংঘটিত করেছে।
স্বাধীন আন্তর্জাতিক ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন প্রধান মারজুকি দারুসমান, সদস্য রাধিকা কুমারস্বামী, সদস্য ক্রিস্টোফার ডমিনিক সিডোটি, ছবি: সংগৃহীত
জাতিসংঘ মিশন অবিলম্বে তাই এ বিষয়ে অভিযুক্ত নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা তদন্ত ও বিচারের জন্য একটি উপযুক্ত প্রসিকিউটর কমিটি এবং আইনি আদালত গঠনের আহ্বান জানিয়েছে।
ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের সদস্যরা জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে বেশ কিছু সুপারিও তুলে ধরেছেন, যার মধ্যে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য মিয়ানমারের সেনাপ্রধান এবং সিনিয়র পাঁচ জেনারেলকে বিচারের মুখোমুখি সুপারিশ করা হয়।
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রাখাইনে নিরাপত্তা বাহিনীর বেশ কিছু স্থাপনায় হামলার অভিযোগে রোহিঙ্গাদের গ্রামে গ্রামে শুরু হয় সেনাবাহিনীর অভিযান। এরপরই শুরু হয় বাংলাদেশ সীমান্তের দিকে রোহিঙ্গাদের ঢল। তাদের কথায় পাওয়া যায় নির্বিচার হত্যা, ধর্ষণ, জ্বালাও-পোড়াওয়ের ভয়াবহ বিবরণ। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা মিয়ানমারের বাহিনীর ওই অভিযানকে ‘জাতিগত নির্মূল অভিযান’ হিসেবে অভিহিত করে আসছে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে মিয়ানমার বলে আসছে, তাদের ওই লড়াই ‘সন্ত্রাসীদের’ বিরুদ্ধে, কোনো জাতিগোষ্ঠীকে নির্মূল করতে নয়।
মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও সরকারের ওই দাবি নাকচ করে দিয়ে ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের প্রাথমিক রিপোর্টে তখন বলা হয়, রাখাইনে যে মাত্রার নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা বলা হচ্ছে, তার তুলনায় গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়ার মধ্যকার পার্থক্যটা খুবই স্পষ্ট।
ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন বলেছে, রাখাইনে যে ধরনের অপরাধ হয়েছে, আর যেভাবে তা ঘটানো হয়েছে, মাত্রা, ধরন এবং বিস্তৃতির দিক দিয়ে তা ‘গণহত্যার অভিপ্রায়কে’ অন্য কিছু হিসেবে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টার সমতুল্য।
গত বছর গঠিত জাতিসংঘের এই ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের সদস্যরা বাংলাদেশসহ পাঁচটি দেশে আশ্রয় নিয়ে থাকা ৮৭৫ জন রোহিঙ্গার সাক্ষাৎকার নিয়ে, নথিপত্র, ভিডিও, ছবি এবং স্যাটেলাইট ইমেজ পর্যালোচনা করে তাদের রিপোর্ট তৈরি করেছেন।
রাখাইনে সেনাবাহিনীর নিপীড়নের যে ধরন, তা শান ও কাচিন অঞ্চলে জাতিগত সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোর ওপর দমন পীড়নের ধরনের সাথে পুরোপুরি মিলে যায় বলেও তদন্তকারীরা দেখতে পান।
নির্যাতিত রোহিঙ্গা আর প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণের ভিত্তিতে তুলাতলি গ্রামে সেনাবাহিনীর অভিযানের লোমহর্ষক বিবরণও ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের পূর্ণাঙ্গ রিপোর্টে তুলে ধরা হয়েছে।
সেখানে দেখানো হয়েছে, পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করা রোহিঙ্গাদের কিভাবে ধাওয়া করে ধরা হচ্ছে, সৈন্যরা প্রথমে তাদের গুলি করছে, তাতেও মৃত্যু না হলে প্রত্যেকের গলা কেটে ফেলা হচ্ছে। তারপর তারা নজর দিচ্ছে নারী ও শিশুদের দিকে।
ওই গ্রামে শিশুদেরও কিভাবে গুলি করে মারা হয়েছে, মায়ের কোল থেকে কেড়ে নিয়ে নদীতে বা আগুনে ছুড়ে ফেলা হয়েছে সেসব ভয়ঙ্কর বিবরণও এসেছে প্রতিবেদনে।
এই গণহত্যা শেষে মেয়েদের ফিরিয়ে নেয়া হয়েছে গ্রামে। পালা করে ধর্ষণ করার পর কাউকে কাউকে হত্যা করা হয়েছে। বুড়ো, শিশু আর নির্যাতিত নারীদের ঘরের ভেতরে আটকে আগুন দেয়া হয়েছে বাড়িতে। রাখাইনের তুলাতলি গ্রামের এই বর্বরতাকে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর জঘন্যতম অপরাধের নজির হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে এতে।
তথ্যানুসন্ধান মিশনের প্রতিবেদনকে স্বাগত জানিয়েছে ব্রিটেন, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া, পাকিস্তানসহ অধিকাংশ দেশ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি) । তারা রাখাইনে নৃশংসতায় জড়িতদের আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারের আওতায় আনার আহ্বান জানায়। কিন্তু রাশিয়া সরাসরি মিয়ানমারের পক্ষে অবস্থান নিয়ে প্রতিবেদনের তথ্যের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তোলে। আর চীন রাখাইন পরিস্থিতিকে জটিল হিসেবে আখ্যায়িত করে বাংলাদেশের সাথে সংলাপের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানে মিয়ানমারকে উৎসাহিত করে।




সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : gramerka@gmail.com, editor@gramerkagoj.com
Design and Developed by i2soft